One Bangladesh

শেখ রাসেল: আবহমান বাংলার দুরন্ত শৈশবের প্রতিচ্ছবি

শেখ রাসেল: আবহমান বাংলার দুরন্ত শৈশবের প্রতিচ্ছবি
ধানমন্ডি লেকের পূর্বপাড়। ৩১ ও ৩২ নম্বর সড়ক। দুরন্ত গতিতে সাইকেল চালাতো এক শিশু। ব্র্রেক কষতে গিয়ে অথবা মোড় ঘোরার সময়- কখনো পড়ে যেতো।
কিন্তু- কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই- হাওয়ার বেগে সাইকেলটা তুলে নিয়ে- চোখের পলকে প্রজাপতির মতো উড়ে যেতো। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের দুরন্তপনা ছিল এমনই। তাকে নিয়ে, নিজের স্মৃতিগ্রন্থে, এসব অভিজ্ঞতার কথাই লিখেছেন প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা।
ফাল্গুনের চপলা-চঞ্চল বাতাসের মতো উড়ু উড়ু- তুমুল প্রাণবন্ত এক শিশুর নাম শেখ রাসেল। কিন্তু তার মানসপটে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছিলো এক সুকোমল মানবিক সত্তা। এমনকি- পরবর্তীতে- প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবেও তার মধ্যে ছিল না কোনো অহমিকা।
ছোট থেকেই খাবারের প্রতি আগ্রহ কম ছিল রাসেলের। তবে রান্নাঘরে- সবাই যখন খেতে বসতো, তখন কাজের লোকদের সঙ্গে পিঁড়ি পেতে বসে, লাল ফুল আঁকা থালায় করে, ভাত খেতে পছন্দ করতো সে। নিজের পছন্দের খাবারের ভাগ দিতো- প্রিয় কুকুর টমিকে। সকালে-সন্ধ্যায় খোঁজ রাখতো পোষ্য পায়রাগুলোর, আদর করে হাত বোলাতে গোয়ালের গরুর গায়ে।
গৃহশিক্ষিকার সঙ্গেও ছিল তার আদর-আবদারের সম্পর্ক। পরিবারের সদস্যদের মতোই তাকেও ভালোবাসতো রাসেল।
স্বাধীনতার পর- প্রথমবারের মতো পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রাণোচ্ছ্বল সময় কাটানোর সুযোগ আসে রাসেলের জীবনে। সুযোগ পেলেই বাবার আশেপাশে থাকতো। কখনো বিদেশ ভ্রমণের সময় ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গী হতো সে। ছোট্ট রাসেলের উচ্চ শির ও আত্মবিশ্বাসী চাহনিতে মুগ্ধ হতো বিশ্বনেতারা।
১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় রাসেলের বয়স ছিল মাত্র সাড়ে চার বছর, আর ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় সাত বছর। বাঙালি জাতির ভাগ্যনির্ধারণী এই দুটি মাইলফলক- দাগ কেটেছিল রাসেলের শিশু মনে। তাই বড় হয়ে সেনা কর্মকর্তা হতে চেয়েছিল সে। টুঙ্গিপাড়ায় ঘুরতে গেলে- গ্রামের শিশুদের নিয়ে প্যারেড করতো, ডামি বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতো।
রাসেল ছোটবেলা থেকেই ছিল খুব সাহসী, সাবধানী ও উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন। খুব ছোটতে, কালো পিঁপড়া দেখলেই ধরতে যেত। একদিন একটা বড় ও বিষাক্ত কালো পিঁপড়া কামড়ে দেয় তাকে। এরপর থেকে, বড়-কালো পিঁপড়া দেখলেই বলতো ‘ভুট্টো’। পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে আপামর বাঙালির মুক্তির স্লোগান শুনতে শুনতে- আক্রমণকারী শক্তির নাম ভুট্টো হিসেবে চিত্রিত হয়েছিল রাসেলের মানসপটে।
‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে, ১৯৬৭ সালের ২৭ এবং ২৮ মে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আড়াই বৎসরের ছেলে আমাকে বলছে- ৬ দফা মানতে হবে- সংগ্রাম- সংগ্রাম- চলবে চলবে–।’ বঙ্গবন্ধুর বিস্ময় মেটাতে বঙ্গমাতা তখন জানান, সড়কের মিছিল এবং বাসায় আয়োজিত রাজনৈতিক বৈঠকগুলো থেকে- এসব কথা রাসেল নিজে নিজেই শিখেছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে বেড়ে ওঠা শিশু রাসেলের কোমল মন- ক্রমেই বিকশিত হচ্ছিলো- এক নিরন্তর দেশপ্রেমিক হিসেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। ১১তম জন্মদিনের আগেই, বর্বর ঘাতকরা, পরিবারের সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করে তাকে।
তবে অকাল মৃত্যুর অন্ধকারে হারিয়ে যায়নি রাসেল, আবহমান বাংলার চিরায়ত শিশুর প্রতিকৃতি হিসেবে- প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে- বেঁচে আছে সে, বেঁচে থাকবে অনন্তকাল ধরে। রাসেলের অনুকরণীয় শৈশব- প্রতিদিন স্বপ্ন ছড়িয়ে যাবে বাংলার প্রতিটি শিশুর মনে।
সৌজন্যেঃ চ্যানেল আই অনলাইন
লেখকঃ তন্ময় আহমেদ