One Bangladesh

জাতীয় চার নীতি

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মতাদর্শিক স্তম্ভ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল অর্জনের স্মারক হলো জাতীয় চার নীতি
শেখ মুজিবের আবির্ভাব বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব একটি ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি রূপকথার নায়কের মতোই ভাস্বর হয়ে থাকবেন। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইতালিতে ম্যাটসিনি ও গ্যারিবন্ডি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটন ও ভারতের মহাত্মা গান্ধীর মতো বাংলাদেশে স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মহান নায়ক। বঙ্গবন্ধুর সহজাত বিবেচনাবোধ এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল অসাধারণ। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদের প্রতীক এবং নিঃসন্দেহে একজন দেশপ্রেমিক। নতুন একটি সংবিধানে রাষ্ট্রের জনগণকে স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে এগিয়ে দেয়াই ছিল তার কর্মসূচির মূলমন্ত্র।শোষিতের গণতন্ত্র, সামন্তবাদ, উপনিবেশবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের নির্মম শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে নিপীড়িত বাঙালি জাতি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অব্যাহত সংগ্রাম করেছে এবং স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ও প্রেরণা ছিল পুরোনো পাকিস্তানি শাসন-শোষণের রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর পরিবর্তে দুঃখী ও মেহনতি মানুষের রাজনীতি, গণমানুষের স্বার্থে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, শোষণমুক্ত সমাজ অপসংস্কৃতির পরিবর্তে নিজ দেশের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা এর বাস্তবায়ন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। এই সোনার বাংলা গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র, আমরা চাই না শোষকের গণতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু শোষিতের গণতন্ত্র বলতে এমন গণতন্ত্রকে বুঝতেন যা শোষিত মানুষের জন্য। শোষিত মানুষের স্বার্থে এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত। বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক, দুঃখী-মেহনতি মানুষকে যেন কেউ শোষণ করতে না পারে। বঙ্গবন্ধু শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গঠনের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পশ্চাৎপদ অবহেলিত বিশাল জনগোষ্ঠী এবং দেশপ্রেমিক ব্যক্তি, দল ও শক্তির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনড়।
১৯৭২ সালের প্রথমদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দলের এক নতুন ভাবাদর্শগত তত্ত্বের জন্ম দেয় এবং তার ব্যাপক প্রচার শুরু করে। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-এই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে সৃষ্ট এই তত্ত্বের নাম হয় মুজিববাদ। দেশব্যাপী মুজিববাদের প্রচারাভিযানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঘোষণা করেন যে এই তত্ত্বের লক্ষ্য হলো বাঙালি জাতিকে সংহত করা। মুজিববাদ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর ব্যাখ্যা ছিল নিম্নরূপ-
‘মুজিববাদকে ভাবাদর্শ হিসেবে ধরতে গলে দার্শনিকদের তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। আমি শুধু মুজিববাদ নামে যা আখ্যায়িত করা হয়েছে সে সম্পর্কে নিজে যা বুঝি, তা বলতে পারি। সবার আগে আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্র : গণতন্ত্রে বিশ্বাসের সাথে সাথে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শুধু শোষণমুক্ত সমাজেই গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব। ঠিক এ জন্যই আমি। গণতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্রের কথা বলি। আমি আরো বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশে যত ধর্ম আছে, তার সবগুলোর সমঅধিকার থাকবে। এর অর্থ আমি বুঝি ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মপালনের স্বাধীনতা। শেষত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা, কৃষ্টি এবং সমগ্র বাঙালি পরিবেশে অনুপ্রেরণা জোগানোর প্রয়োজনীয়তা। যাকে আমি জাতীয়তাবাদ খায়িত করি। (সূত্র : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, প্রস্তাবনা)
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভিত্তি করে মুজিববাদ গঠিত। চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠিত। চারটি স্তম্ভ হলো-বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। এই চার স্তম্ভকে এক কথায় বলা যায় অসাম্প্রদায়িক বাঙালি গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র। অসাম্প্রদায়িক বলতে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বোঝানো হয়েছে।
মুজিববাদের চারটি উপাদানের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা অতিরিক্তভাবে একাধিকবার অবস্থান করছে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজবাদ-এর কোনটাই সফল নয় ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থা ছাড়া। ধর্মাশ্রিত জাতীয়তাবাদ মুখ্যত সাম্প্রদায়িকতা; গণতন্ত্র বস্তুত সর্বশ্রেণির সম্প্রদায় চেতনা নিরপেক্ষ, সমাজবাদ ধর্ম মুখাপেক্ষী নয়। মুজিববাদের অন্যতম উপাদান হচ্ছে সমাজবাদ।
১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রথম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজতন্ত্রকে নির্বাচন করা হয়। এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়।সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলনে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের একটি রূপরেখাও তিনি প্রস্তাব করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণিকে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সংবিধানেও কতকগুলো রাষ্ট্রীয় মৌলিক নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মহান সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে যে, যে সকল মহান আদর্শ বা চেতনা আমাদের বীর বাঙালি জাতিকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহিদদের প্রাণোতৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা হল-জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা এ মহান সংবিধানের মূলনীতি হবে’। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে ৮নং অনুচ্ছেদ থেকে ২৫নং অনুচ্ছেদ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ সন্নিবেশিত করা হয়েছে। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল অনুপ্রেরণা, এ চারটি নীতি ও আদর্শ।
১. জাতীয়তাবাদ
বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলো বাঙালি থেকে বাংলাদেশ। বাঙালিরা দীর্ঘ ১ মাস যুদ্ধ করে বাংলাদেশের সৃষ্টি করেছেন। তা করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী নেতৃত্বে। বাঙালিদের এ যুদ্ধ হাজার বছরের সংগ্রামের ঘনীভূত রূপ। তাই ব্যাপকভাবে বলতে গেলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলো বাঙালি জাতির প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসের বিকশিত গতিধারার রূপায়ণ। এর পরিধি অসীম। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল চরম মরণ-সংগ্রামে। জাতীয়তাবাদ না হলে কোন জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে আমরা এগিয়ে গিয়েছি। আমরা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করি। জাতীয়তাবাদের অনেক সংজ্ঞা আছে। অনেক ঋষি, অনেক মনীষী, অনেক বুদ্ধিজীবী, অনেক শিক্ষাবিদ এ সম্পর্কে অনেক রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন। সুতরাং, এ সম্বন্ধে আমি আর নতুন সংজ্ঞা না-ই দিলাম। আমি শুধু বলতে পারি, আমি বাংলাদেশের মানুষ, আমি একটা জাতি।
এই যে জাতীয়তাবাদ, সে সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে চাই। ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন—সকল কিছুর সঙ্গে একটা জিনিস রয়েছে। সেটা হলো অনুভূতি। এই অনুভূতি যদি না থাকে, তাহলে কোন জাতি বড় হতে পারে না। এবং জাতীয়তাবাদ আসতে পারে না। অনেক জাতি দুনিয়ায় আছে, যারা বিভিন্ন ভাষাবলম্বী হয়েও এক-জাতি হয়েছে। অনেক দেশে আছে, একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু নিয়ে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে–তারা এক জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর।
সে জন্য আজ বাঙালি জাতি যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে, যার উপর ভিত্তি করে আমরা স্বাধীনতা নিয়েছি, যার উপর ভিত্তি করে আমরা সংগ্রাম করেছি, সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
আমাদের মহান সংবিধানের প্রধান চারটি স্তম্ভের মধ্যে একটি অন্যতম স্তম্ভ জাতীয়তাবাদ। অভিন্ন ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে একই ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে লালিত, বাঙালি জাতি ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে নিজেদের ঐতিহ্য ও মননে পাকিস্তানি জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা মনে করতে শুরু করে। বাঙালি সাধারণ জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তি সংগ্রামের মহান চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তাই আমাদের সংবিধানের ৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট, যা বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছিলেন সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতির মূলে রয়েছে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অভিন্নতা। বাঙালিরা একটি স্বতন্ত্র জাতি। এই জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করেই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে তারা বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বস্তুত আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি। আমরা একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন জাতি। এ স্বাতন্ত্র্যবোধ ও স্বকীয়তাই আমাদের এক সুদৃঢ় ঐক্যে ঐক্যবদ্ধ করেছে।
২. সমাজতন্ত্র
বঙ্গবন্ধু মনে করতেন দুর্নীতি প্রথাগত এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার একটি প্রক্রিয়াজাত ফলাফল। সেজন্য বঙ্গবন্ধ ঘুণে ধরা পুঁজিবাদী সমাজকে ভেঙে নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বাকশাল কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।
আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি। এবং বিশ্বাস করি বলেই আমরা এগুলি জাতীয়করণ করেছি। যারা বলে থাকেন, সমাজতন্ত্র হলো না, সমাজতন্ত্র হলো না, তাদের আগে বোঝা উচিত, সমাজতন্ত্র কী।
প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে চলে অর্থ সম্পদের অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং দরিদ্র জনসাধারণের এ ধরনের আর্থপ্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ পায় না। কেবল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের আর্থসামাজিক মানবাধিকার ও জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দিতে পারে। সমাজতন্ত্রের জন্মভূমি সোভিয়েত রাশিয়ায় ৫০ বছর পার হয়ে গেল, অথচ এখনও তারা সমাজতন্ত্র বুঝতে পারে নাই। সমাজতন্ত্র গাছের ফল না – অমনি চেখে খাওয়া যায় না। সমাজতন্ত্র বুঝতে অনেক দিনের প্রয়োজন, অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়। সেই পথ বন্ধুরও হয়। সেই পথ অতিক্রম করে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানো যায়।
সে জন্য পহেলা স্টেপ, যাকে প্রথম স্টেপ বলা হয়, সেটা আমরা গ্রহণ করেছি—শোষণহীন সমাজ। আমাদের সমাজতন্ত্রের মানে শোষণহীন সমাজ। সমাজতন্ত্র আমরা দুনিয়া থেকে হাওলাত করে আনতে চাই না। এক এক দেশ, এক এক পন্থায় সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলেছে।
সমাজতন্ত্রের মূলকথা হলো, শোষণহীন সমাজ। সেই দেশের কী ক্লাইমেট, কী ধরনের অবস্থা, কী ধরনের মনোভাব, কী ধরনের আর্থিক অবস্থা, সব কিছু বিবেচনা করে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যেতে হয় সমাজতন্ত্রের দিকে এবং তা আজকে স্বীকৃত হয়েছে।
রাশিয়া যে পন্থা অবলম্বন করেছে, চীন তা করে নাই, সে অন্যদিকে চলেছে। রাশিয়ার পার্শ্বে বাস করেও যুগোস্লাভিয়া, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া তাদের দেশের এনভাইরমেন্ট নিয়ে, তাদের জাতির ব্যাক গ্রাউন্ড নিয়ে, সমাজতন্ত্রের অন্য পথে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যান- ইরাক একদিকে এগিয়ে চলেছে, আবার মিসর অন্যদিকে চলেছে।
বিদেশ থেকে হাওলাত করে এনে কোনদিন সমাজতন্ত্র হয় না, তা যারা করছেন, তারা কোনদিন সমাজতন্ত্র করতে পারেন নাই। কারণ – লাইন, কমা, সেমিকোলন পড়ে সমাজতন্ত্র হয় না, যেমন আন্দোলন হয় না।
সে জন্য দেশের এনভাইরমেন্ট, দেশের মানুষের অবস্থা, তাদের মনোবৃত্তি, তাদের ‘কাস্টম’, তাদের আর্থিক অবস্থা, তাদের মনোভাব, সব কিছু দেখে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যেতে হয়। একদিনে সমাজতন্ত্র হয় না। কিন্তু আমরা নয় মাসে যে পদক্ষেপগুলি নিয়েছি, তা আমার মনে হয়, দুনিয়ার কোন দেশ, যারা বিপ্লবের মাধ্যমে Socialism করেছে, তারাও আজ পর্যন্ত তা করতে পারে নাই- আমি চ্যালেঞ্জ করছি। কোন কিছু করলে কিছু অসুবিধার সৃষ্টি হয়ই। সেটা প্রোসেসের-এর মাধ্যমে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।
মহান সংবিধানের অন্যতম একটি মূলনীতি সমাজতান্ত্রিক বিধিবিধানের উপস্থিতি। বাংলাদেশে একটি শোষণমুক্ত এবং সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করা হবে, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা নয়। সংবিধানের ১০নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে যে, মানুষের ওপর মানুষের শোষণের অবসান করে ন্যায়ানুগ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম করা হবে। সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সংবিধানে উল্লেখ করা হয়। যে, রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে যেকোন ধরনের সম্পত্তিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনে গ্রহণ করতে পারবে। সংবিধানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মেহনতি মানুষকে সকল প্রকার শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। রাষ্ট্রের উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার মালিক হবে জনগণ তথা রাষ্ট্র। আইনের ধারা আরোপিত সীমার মধ্যে ব্যক্তিগত মালিকানার বিধানও রাখা হয়।
৩. গণতন্ত্র
বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্র হল এমন এক গণতন্ত্র, যা গরীব মানুষের জন্য, তাদের স্বার্থে এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত। এর অর্থ হল এই যে, আজকে যে প্রচলিত গণতন্ত্র রয়েছে যেখানে সংখ্যালঘিষ্ট কতিপয় ধনীক চক্র রাষ্ট্রক্ষমতাকে দখল করে আছে, তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ট বিপুল গণ-মানুষ সেই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাকে উলটে দিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনায় সরাসরি অংশ নেবে, অধিকাংশ জনগণের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ত করবে এবং রাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে।
গণতন্ত্রের অর্থ হলো, অল্পাংশের উপর অধিকাংশের শাসন। কিন্তু যে গণতন্ত্র প্রচলিত রয়েছে তা হচ্ছে অধিকাংশের উপর অল্পাংশের শাসন। সুতরাং বর্তমান প্রচলিত গণতন্ত্র, গণতন্ত্রের অর্থেই অগণতান্ত্রিক। বর্তমানে সমাজ ব্যবস্থায় অংশ লোক ধনিক-বনিক লুটেরা শ্রেণী। তাই অল্পাংশের জন্য যে গণতন্ত্র সমাজে প্রচলিত রয়ছে তা শোষকের গণতন্ত্র। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই অল্পাংশের গণতন্ত্র তথা লুটেরাদের গণতন্ত্রকে বাংলার মাটি হতে চিরদিনের মত বিতাড়িত করে তদস্থলে অধিকাংশের অর্থাৎ শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিষ্কারভাবে বলেছেন “আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র, সেই গণতন্ত্র যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে। আগেও আমরা দেখেছি যে, গণতন্ত্র যে সব দেশের চলেছে, দেখা যা, সেই সব দেশে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের প্রটেকশন দেওয়ার জন্য কাজ করে এবং সেখানে প্রয়োজন হয় শোষকদের রক্ষা করার জন্যই গণতন্ত্রের ব্যবহার। সে গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই, শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হল, আমরা দেশে যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে তাতে সে সব বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে এ দেশের দুঃখী মানুষ রক্ষা পায়, শোষকেরা যাতে রক্ষা পায় তার ব্যবস্থা নাই। সেজন্য আমাদের গণতন্ত্রের সঙ্গে অন্যের পার্থক্য আছে। সেটা আইনের অনেক সিডিউলে রাখা হয়েছে, অনেক বিলে রাখা হয়েছে। অনেক আলোচনা হয়েছে যে, কারোর সম্পত্তি কেউ নিতে পারবেনা। কিন্তু যে চক্রদিয়ে মানুষকে শোষণ করা হয়, সেই চক্রকে আমরা জনগণের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে চাই। তার জন্য আমরা প্রথমেই ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স কোম্পানী, কাপড়ের কল, পাটকল, চিনির কারখানা সব কিছু জাতীয়করণ করে ফেলেছি। তার মানে হলো, শোষকগোষ্ঠী যাতে এই গণতন্ত্র ব্যবহার করতে না পারে। শোষিতকে রক্ষা করার জন্য এই গণতন্ত্র ব্যবহার করা হবে।” প্রচলিত গণতন্ত্রের অবাধ অধিকার ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অজুহাতে জনস্বার্থ বিরোধী, দেশদ্রোহী, মানবতা-বিরোধী কাজ চলে কিন্তু শোষিতের গণতন্ত্র জনস্বার্থ বিরোধী কাজকে প্রশ্রয় দেয়না। “অন্যকে ভুখা, নাঙ্গা করবার, অন্যকে নিঃস্ব বানাবার, যুদ্ধের উস্কানী দিয়ে মানুষের ধ্বংস ডেকে আনার, মানুষের স্বাস্থ্য, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে বেসাতি করে মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনকে কলুষিত করবার, এক কথায় মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার কোন স্বাধীনতাই এ গণতন্ত্রে বরদাশত করা হয় না। বঙ্গবন্ধু বলেন, “বিশেষ করে কৃষক শ্রমিক, দুঃখী, মেহনতী মানুষকে যেন কেউ একস্পলয়েট করতে না পারে। তাদের শোষণ করার জন্য যারা দায়ী সেই শোষকদের অধিকার খর্ব করা হবে।শোষকদের সর্বপ্রকার শোষণের অধিকারকে শোষিতের গণতন্ত্র বাতিল করে দেয়। “শ্রেণীর উর্ধে কোন গণতন্ত্র কখনো হয়নি। গণতন্ত্র বরারই কোন না কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীর স্বার্থ প্রতিফলিত করে আসছে।”
শোষিতের গণতন্ত্রে প্রতিফলিত হবে শোষিতদের মৌলিক রাজনৈতিক, আর্থ- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। শোষিতের গণতন্ত্রে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে বিভিন্ন ভাবে দেখানো যেতে পারে। প্রথমত : এটি হলো আর্থ সামাজিক অধিকার। যেমন, কাজের অধিকার, বিশ্রাম, শিক্ষা, স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখার অধিকার। দ্বিতীয়টি হলো রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতা, যেটার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াদিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, যেমন নির্বাচন, বাকস্বাধীনতা, প্রচার ও প্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশ ও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করার অধিকার। তৃতীয়টি হল বিবেকের স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বত্তার প্রকাশ, ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের গোপনীয়তা এবং চলাচলের স্বাধীন অধিকারসমূহ।শোষিতের গণতন্ত্রে এ সব অধিকার-এর সঙ্গে যুক্ত হয় তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জবাবদিহিতা ও দায়িত্বসমূহ।
শোষিতের গণতন্ত্র হল গণতন্ত্রের সর্বোচ্চরূপ যা সংখ্যাগরিষ্ঠের নিয়ন্ত্রণে তাদের স্বার্থে পরিচালিত। অর্থনৈতিকভাবে এ গণতন্ত্র শোষণের অবসান ঘটায়, জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রীয়-ব্যক্তি খাত গড়ে তোলে। রাজনৈতিকভাবে এ গণতন্ত্রে ব্যক্তি সামাজিককের নিকট দায়ী থাকে, মৌলিক অধিকার ভোগ করে এবং দায়িত্ব পালন করে। এ গণতন্ত্র বস্তুগত গ্যারান্টির মাধ্যমে মৌলিক অধিকারকে কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলে।
সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে গণতন্ত্র এবং স্বৈরশাসনের অবসান। আমাদের সংবিধানের ১১ নং অনুচ্ছেদে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ‘প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে; মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থা হবে গণতান্ত্রিক। প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নাগরিকগণ । রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করতে পারবে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য দূর করাই হবে গণতন্ত্রের লক্ষ্য। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন ব্যবস্থার একটি পরিপূর্ণ রূপ নির্দেশ করবে। গণতন্ত্র শুধু শাসনব্যবস্থার রূপ নির্দেশ করবে না, সামাজিক আদর্শ হিসেবেও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। রাষ্ট্র পরিচালনার সকল স্তরে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।
৪. ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা
সংবিধানের অন্যতম মূল আদর্শ বা নীতি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। আমাদের সংবিধানের ১২নং অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সকল নাগরিকদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। প্রত্যেক নাগরিক তার নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচার করতে পারবে। কোন বিশেষ ধর্মাবলম্বী ব্যক্তির প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ কোন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বা তার প্রতি কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। সমাজজীবন হতে সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা হবে রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
সমাজজীবন হতে সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থা কায়েম করা হবে রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়। তাই ৭২-এর সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার, কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তার উপর উৎপীড়ন করা হবে না।’
১৯৭২ সালের ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। খ্রিষ্টান তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই,ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আল বদর পয়দা করা বাংলার বুকে আর চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরও বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। তাতে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা আইন করে ধর্মকে নিষিদ্ধ করতে চাই না এবং করব না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার মতো ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। তাদের বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জোচ্চরি, ধর্মের নামে বেঈমানি, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যভিচার বাংলাদেশের মাটিতে চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে। আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় ব্যবস্থা করেছি।’ (গণপরিষদের ভাষণ, ১২ অক্টোবর ১৯৭২)
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাই কোনো ফাঁপা বাগাড়ম্বর নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মুলনীতিকে নির্দেশ করে।

আওয়ামীলীগ #মুজিববর্ষ #আওয়ামীলীগ #শেখমুজিবুররহমান